চারদিকে রক্ত আর রক্ত, মাটিতে ক্ষতবিক্ষত দেহ

0 ৪৬

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। সেই সময় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হিসেবে প্রোগ্রামের শুরু থেকেই ছিলেন। ভীতিকর এ পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি কথা বলেছেন আমাদের সময়ের একান্ত আলাপচারিতায়। কথা প্রসঙ্গে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ২১ আগস্ট ছিল সন্ত্রাসবিরোধী আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ। পূর্বনির্ধারিত ওই সমাবেশ শেষে আমাদের মিছিল করার কর্মসূচি ছিল। ওই মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার। যা হোক, একটি ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চে নির্ধারিত সময়েই সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশ শেষ হবে, এমন একটি মুহূর্তে সমাবেশের ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে যায় সমাবেশস্থল।’

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের এ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘নেত্রীর বক্তব্য শেষের দিকে। আমি মঞ্চ থেকে নেমে ট্রাকের পাশেই দাঁড়ালাম। এমন অবস্থায় গ্রেনেড নিক্ষেপ শুরু হয়। গ্রেনেড নিক্ষেপ যখন থামল তখন ধীরে ধীরে গুলি হচ্ছিল, টিয়ার গ্যাসের শেলিং হচ্ছিল। গ্রেনেডের আঘাতে ঘটনাস্থলে আমার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। আমি জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ি। সেই গ্রেনেডের বিকট শব্দে আমি আবার জ্ঞান ফিরে পাই। জ্ঞান ফিরে মঞ্চের দিকে তাকাই। চারদিকে রক্ত আর রক্ত, ক্ষতবিক্ষত দেহ মাটিতে পড়ে আছে। জিজ্ঞেস করি নেত্রী বেঁচে আছেন কিনা। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এ অবস্থায় মহিলা আওয়ামী লীগের কিছু নেত্রী আমাকে উদ্ধার করে এবং পাশের বিল্ডিংয়ে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ধানমন্ডির বাংলাদেশ মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিন দিন আইসিইউতে থাকার পর কিছুটা সুস্থতা বোধ করি। এমন অবস্থা থেকে বেঁচে গিয়েছি, এটা সৃষ্টিকর্তার বিশেষ সহানুভূতি আমার পক্ষে ছিল বলেই হয়তো সম্ভব হয়েছে।’

এমন একটা হামলার পরও তৎকালীন প্রশাসন কোনো সহায়তা করেনি উল্লেখ করে নাছিম বলেন, ‘২১ আগস্ট যারা আহত বা নিহত হয়েছেন তাদের সহযোগিতা করার জন্য সরকারের কোনো সহযোগিতার হাত ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে এসে মানুষকে উদ্ধার করে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু তারা তা করেনি। বরং দেখা গেছে, অন্যদিন যেভাবে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশের তৎপরতা থাকত ২১ আগস্টের দিন সেই তৎপরতা ছিল না। সেদিন দেখা গেছে, গ্রেনেড হামলার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল নিক্ষেপ এবং গুলিবর্ষণ করেছেন। ২১ আগস্টে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কিছু কর্মকর্তা এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে। সেদিন যারা আহত হয়েছিল তাদের হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থায় বাধা দেওয়া হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্তরা যেন চিকিৎসাসেবা না পায় সেজন্য তারা নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ নেওয়া হয়।’

‘সেদিন আমরা যারা আহত অবস্থায় প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছি সেখানেও তারা ফোন দিয়ে বিভিন্নভাবে হুমকিধমকি দিয়েছে। এমনকি তাদের বের করে না দেওয়া হলে বোমা মেরে হাসপাতাল উড়িয়ে দেওয়া হবে। এমন হুমকি দেওয়া হয়েছিল হাসপাতাল মালিকদের। একই সঙ্গে সেদিন আমরা যারা চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে চেয়েছিলাম এয়ারপোর্টে কিন্তু আমাদের বাধা দেওয়া হয়েছে, আটকে রাখা হয়েছে’- আক্ষেপের সঙ্গে বলেন নাছিম।

উল্টো জজ মিয়ার মতো ভুয়া নাটক করে অনেক মামলাও আমাদের দিয়েছে এবং গ্রেনেড হামলার মূল ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গ্রেনেড হামলায় চারদিকে আহত নেতাকর্মী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও সেই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ও সব সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ঘটনাস্থলেই প্রতিবাদ সভা ও মিছিল মিটিং করছিলেন। তিনি বলেন, এক একটি গ্রেনেডে প্রচুর পরিমাণে স্পিøন্টার থাকে। যখন আঘাত করে তখন বোঝা যায় না। কিন্তু যখন রক্ত ঝরতে থাকে, তখন তার যন্ত্রণা বোঝা যায়, তার বিষক্রিয়া কী ভয়াবহ। সেদিন ট্রাকের ওপরে যেসব গ্রেনেড পড়েছিল তা যদি বিস্ফোরিত হতো তা হলে কেউ বেঁচে থাকত না। আর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আজ কোন দিকে যেত সেটি স্পষ্টভাবে এখন বোঝা যায়।’ বলেন আওয়ামী লীগের এ নেতা।

আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিএনপি-জামায়াতের অপশক্তির মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে পাকিস্তানি ভাবধারায় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান, এর ভেতর দিয়ে মৌলবাদী জঙ্গিবাদী শক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে পাকিস্তানে রূপান্তর করা এবং ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র তৈরি করা। ঠিক একইভাবে ২০০৪ সালে একুশে আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বিনির্মাণের যে শক্তি, সেই শক্তিকে ধ্বংস করে দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধ্বংস করা হত্যা করা।’ তিনি বলেন, ‘একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর আমরা দেখেছি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কীভাবে দেশে সন্ত্রাসের উত্থান হয়েছে। আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল নিক্ষেপ এবং গুলিবর্ষণ করেছেন। সেদিন এত মানুষ রক্তাক্ত হয়েছে, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কেউ সেই স্থান পরিদর্শন পর্যন্ত করেনি। মূলত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত বিএনপি-জামায়াত সরকার সরাসরি যুক্ত ছিলেন।’ #সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহম্মদ আকবর

0 0 vote
Article Rating
আরও পড়ুন
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x