চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন অভিনেতা হুমায়ূন সাধু ।

0 ৯৮

চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন নির্মাতা ও অভিনেতা হুমায়ূন সাধু । গত বছরের ২৫ অক্টোবর মাত্র ৩৭ বছর বয়সে অকাল প্রয়াণ হয় এই অভিনেতার। অভিনয় ফেলে বহুদূরে চলে গেলেও ভক্তরা তাকে অনুভবে হৃদয়ে  চেতনায় ধারণ করে আছেন। তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কাছে তন্দ্রা আজ অসহায়!
সাধুর জন্ম চট্টগ্রাম জেলায়, শৈশব ও কৈশোর কেটেছে জন্মস্থান চট্টগ্রামেই। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। তার মা মরিয়ম বেগম সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। মরিয়ম বেগম সর্বদা হিন্দি, ইংরেজি এবং বাংলা চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করেন।

পিয়ানোবাদক, লাইফ ইজ বিউটিফুল, চিলড্রেন অব হ্যাভেন, সিটি অব গড এবং ফেলুদা- এমন কয়েকটি চলচ্চিত্র হুমায়ুন তার মায়ের সঙ্গে দেখেছেন। এতে করে তার চলচ্চিত্র তৈরি ও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মে।

সাধু দৈহিক গঠনে একটু ছোট হওয়ায় তার বাবা স্কুলে পাঠাতে চাইছিলেন না। তার বড় বোনের কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে বড় বোন তাকে রঙ্গিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠান। কিন্তু বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। হুমায়ূনের বড় ভাই সাইফুল কবীর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের ছাত্র। তিনি আবার হুমায়ূনকে সেই স্কুলে নিয়ে যান এবং প্রথম সাময়িক পরীক্ষা পর্যন্ত তাকে সুযোগ দেয়ার অনুরোধ করেন। হুমায়ুন দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১৩০ জন ছেলে-মেয়েকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন। সহপাঠীরা তখন হুমায়ূনকে কাঁধে নিয়ে উল্লাস করে। হুমায়ুন পরিবারও মিষ্টি কিনে খাইয়েছিল পাড়ার লোকদের।

ঢাকার বিভিন্ন রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে ঠিকানাহীনভাবে কিছুকাল কাটে। এরপর চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে পরিচয় ও তার সঙ্গে সহকারী পরিচালক হিসেবে অভিনয় জগতে কাজ শুরু করেন। কলেজ চলাকালীন চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের (চট্টগ্রাম ফিল্ম সেন্টার) সাইবাল চৌধুরী এবং জাভেদ আহসান তাকে চলচ্চিত্রে কাজ করার বিষয়ে আগ্রহী করে তোলেন। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে সিনেমার জগতে প্রবেশ করেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘হোমো-সেপিয়েন্স’ এর মধ্য দিয়ে। তার প্রথম শর্টফিল্ম ‘গুঞ্জন’ চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের সহায়তায় নির্মিত হয়েছিল। এটি ব্রিটিশ কাউন্সিল মিলনায়তনে প্রদর্শিত হয়েছিল। ‘বেঁচে থাকার জন্য আমি’ ‘পাখি পাকা পেঁপে খায়’ নামে নাটক সিরিজ তৈরি করেন।

হুমায়ূন সাধু এসএসসি পাসের পর নাসিরাবাদ কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণ চলচ্চিত্র দেখার নেশায় এইচএসসির রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হন।

হুমায়ূন সাধুর আলোচিত নাটক ‘চিকন পিনের চার্জার’। নাটকটির লেখক ও পরিচালক তিনি নিজেই। এ নাটকে অভিনয়ও করেছেন এবং তার বিপরীতে ছিলেন অভিনেত্রী শাহতাজ। টেলিফিল্ম ছবিয়াল রি-ইউনিয়নের অংশ হিসেবে বানিয়েছেন এটি। জীবন থেকে নেওয়া গল্প পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। নাটকটির পটভূমি ছিল ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্মার্ট মেয়ের সঙ্গে আলাপসালাপ চলতে থাকে সাধুর। প্রেমই হয়ে যায় এক রকম। মেয়েটির সঙ্গে যখন তিনি বাস্তবে দেখা করতে যান, তখন মেয়েটি সব কিছু অস্বীকার করে বসে। খুব দুঃখ পান সাধু। পরে তিনি একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি হন—মেয়েরা যেমন হ্যান্ডসাম ছেলে পছন্দ করে, ছেলেরাও তো বেঢপ কাউকে গ্রহণ করে না। তাহলে কি এই মানুষগুলো মানুষ নয়?

২০১০ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলে ক্যাথরিন মাসুদের অধীনে একটা কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলেন সাধু। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘গড ভার্সেস গড’ নামে একটি শর্টফিল্ম তৈরি করেন। ২০১২ সালে তার পরিচালিত প্রথম নাটক ‘দরশন’ বৈশাখী টিভিতে প্রচারিত হয়। তিনি সাতটি টিভি নাটক পরিচালনা করেছেন। ‘সিজোফ্রেনিয়া’ ও ‘অ-মানুষিক’ নামে দুটি টেলিফিল্মও বানিয়েছেন। অভিনয় করেছেন সমানসংখ্যক নাটকে।

সর্বশেষ অভিনেতা হিসেবে দেখা গেছে মাবরুর রশিদ বান্নাহর ‘ভিউ বাবা’ নামের একটি নাটকে। হুমায়ূন সাধুর লেখা অবলম্বনে বেশ কিছু শর্টফিল্ম ও নাটক তৈরি হয়েছে। তার লেখা গল্পের বই ননাই প্রকাশিত হয়েছে।

মুক্তি প্রতীক্ষিত ‘বিউটি সার্কাস’ ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। এখানে তিনি একজন সার্কাসের ক্লাউন হিসেবে অভিনয় করেছেন।

0 0 vote
Article Rating
আরও পড়ুন
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x